|

নার্সিসিস্টদের মধ্যে থাকা ১৩টি ‘শয়তানি’ বৈশিষ্ট্য

আসসালামুয়ালাইকুম প্রিয় পাঠক,

মানুষকে আমরা সাধারণত তার কথাবার্তা, পোশাক, সামাজিক অবস্থান কিংবা মানুষের সামনে তার ব্যবহার দিয়ে বিচার করি।

কেউ খুব হাসিখুশি—আমরা বলি, মানুষটি নিশ্চয়ই ভালো।

কেউ খুব ভদ্র—আমরা বলি, মানুষটি নিশ্চয়ই সৎ।

কেউ খুব আত্মবিশ্বাসী—আমরা বলি, মানুষটি নিশ্চয়ই শক্তিশালী।

কিন্তু মানুষের একটি দিক আছে, যা সবসময় প্রকাশ্যে দেখা যায় না।

সেটি হলো তার অন্ধকার দিক।

একজন মানুষ একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং নিষ্ঠুর হতে পারেন।
ভদ্র এবং নিয়ন্ত্রণকারী হতে পারেন।
ভালোবাসার কথা বলতে পারেন, আবার সেই ভালোবাসাকেই ব্যবহার করে অন্য মানুষকে দুর্বল করে দিতে পারেন।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—এই অন্ধকার সবসময় রাগী মুখ নিয়ে আসে না। কখনো এটি আসে একটি সুন্দর হাসি, মিষ্টি কথা, অতিরিক্ত প্রশংসা কিংবা অসহায় মানুষের অভিনয়ের আড়ালে।

তাই প্রশ্ন হলো—

মানুষের এই অন্ধকার দিক আমরা কীভাবে চিনব?

নিচের ১৩টি আচরণগত সংকেত আমাদের সে বিষয়ে ভাবতে সাহায্য করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ কথা: এই ১৩টি বৈশিষ্ট্য কোনো ব্যক্তিকে “নার্সিসিস্ট”, “সাইকোপ্যাথ” বা “শয়তান” হিসেবে চিহ্নিত করার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়। একজন মানুষের আচরণ বোঝার জন্য তার দীর্ঘমেয়াদি আচরণ, পরিস্থিতি এবং সম্পর্কের সামগ্রিক চিত্র দেখতে হয়। বিশেষ করে “শয়তানি শক্তি”, “কালো চোখ” ইত্যাদি শব্দ আধ্যাত্মিক বা রূপক ব্যাখ্যা—বৈজ্ঞানিক রোগনির্ণয় নয়।


১. বিজয়ের হাসি—যখন অন্যের কষ্টে নিজের জয় অনুভূত হয়

কখনো কখনো একজন মানুষ অন্যকে অপমান করে, ছোট করে বা বিপদে ফেলে এমন একটি হাসি দেন, যেন তিনি কোনো বড় বিজয় অর্জন করেছেন।

এটি সাধারণ হাসি নয়।

সেখানে থাকতে পারে—

“আমি তোমাকে হারিয়েছি।”

“এখন তুমি আমার নিয়ন্ত্রণে।”

“তোমার দুর্বলতা আমি জেনে গেছি।”

সম্পর্কে এই ধরনের আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।

কারণ সুস্থ সম্পর্কের মানুষ আপনার দুর্বলতা জানলে সাধারণত সেটিকে আপনার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন না।

একটি উদাহরণ

স্বামী জানেন স্ত্রী তার কোনো বিষয়ে খুব সংবেদনশীল। ঝগড়ার সময় তিনি ইচ্ছা করে সেই দুর্বল জায়গায় আঘাত করলেন এবং স্ত্রী কাঁদতে শুরু করলে মুচকি হাসলেন।

এখানে সমস্যাটি শুধু রাগ নয়।

সমস্যাটি হলো—অন্যের কষ্টকে নিজের ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে উপভোগ করা।


২. কৃত্রিম হাসি—মুখ হাসছে, কিন্তু সম্পর্ক উষ্ণ নয়

সব হাসি আনন্দের প্রকাশ নয়।

কখনো মানুষের মুখ হাসে, কিন্তু চোখে থাকে না কোনো আন্তরিকতা।

সে আপনার সঙ্গে খুব মিষ্টি করে কথা বলছে, অথচ তার আচরণের অন্য অংশগুলো বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প।

এখানে আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে:

মানুষের একটি মুহূর্তের মুখভঙ্গি দিয়ে তার চরিত্র বিচার করা যায় না।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যদি কথার সঙ্গে আচরণের অমিল দেখা যায়, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কারণ মানুষের সত্যিকারের চরিত্র অনেক সময় তার কথার চেয়ে তার ধারাবাহিক আচরণে বেশি প্রকাশ পায়।


৩. ফাঁকা দৃষ্টি—মানুষটি সামনে, কিন্তু সংযোগ কোথায়?

কখনো আপনি কারও সঙ্গে কথা বলছেন, কিন্তু মনে হচ্ছে সে আপনার কথার সঙ্গে সত্যিকারেরভাবে যুক্ত হচ্ছে না।

চোখ আপনার দিকে, কিন্তু মন যেন অন্য কোথাও।

এটি নিজে কোনো “অন্ধকার চরিত্রের” প্রমাণ নয়। ক্লান্তি, মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, ট্রমা বা অসংখ্য স্বাভাবিক কারণেও মানুষের এমন অভিব্যক্তি হতে পারে।

তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

সে কি আপনার অনুভূতিকে বুঝতে চেষ্টা করছে?

নাকি শুধু আপনার দুর্বলতা, ভয় ও প্রয়োজনগুলো পর্যবেক্ষণ করছে?

দুটির মধ্যে পার্থক্য বিশাল।


৪. তুচ্ছ ঘটনায় বিস্ফোরণ—রাগ যখন ক্ষমতার অস্ত্র

সব মানুষই রাগ করেন।

রাগ মানবিক।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন সামান্য ঘটনা নিয়মিতভাবে বিশাল বিস্ফোরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একটু দেরি হয়েছে—চিৎকার।

একটি প্রশ্ন করা হয়েছে—অপমান।

মতামত ভিন্ন হয়েছে—সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার হুমকি।

“না” বলা হয়েছে—প্রতিশোধ।

এখানে প্রশ্ন হওয়া উচিত:

রাগ কি শুধু আবেগ, নাকি অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি?

কারণ একজন মানুষ যদি বারবার রাগ দেখিয়ে আপনাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যান যেখানে আপনি নিজের স্বাভাবিক কথা বলতেও ভয় পান, তাহলে সেটি একটি গুরুতর সম্পর্কগত সমস্যা।


৫. মুহূর্তেই চরিত্র বদলে যাওয়া

এক মিনিট আগে প্রচণ্ড রাগ।

কয়েক মিনিট পরেই হাসিমুখে অন্য মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ।

এমনকি কিছুক্ষণ আগে আপনাকে অপমান করার পরেও যেন কিছুই ঘটেনি।

এটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত করতে পারে।

আপনি ভাবতে পারেন—

“তাহলে কি আমি বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি?”

এই জায়গাতেই অনেক মানুষ নিজের অনুভূতিকে সন্দেহ করতে শুরু করেন।

তবে আবেগ দ্রুত পরিবর্তন হওয়া একাই কোনো ব্যক্তিত্বের রোগের প্রমাণ নয়। মানুষ পরিস্থিতি অনুযায়ী আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতেও পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:

সে কি নিজের আচরণের দায়িত্ব নেয়?

ভুল হলে কি ক্ষমা চায়?

নাকি আপনাকেই সবসময় দোষী বানায়?


৬. সহানুভূতির অভাব—আপনার কান্না কি তার কাছে শুধু একটি ‘তথ্য’?

একজন মানুষ যখন আপনাকে ভালোবাসে, তখন আপনার কষ্ট তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা।

কিন্তু অন্ধকার সম্পর্কের একটি বৈশিষ্ট্য হতে পারে—আপনার অনুভূতি তার কাছে অনুভূতি নয়, বরং ব্যবহারের উপাদান।

আপনি কোথায় দুর্বল?

কীসে ভয় পান?

কোন কথায় ভেঙে পড়েন?

কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন?

এসব তথ্য যদি পরে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ বা আঘাত করার জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সম্পর্কের সংকেত।


৭. গ্যাসলাইটিং—যখন আপনাকেই নিজের স্মৃতির বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়

এটি মানুষের অন্ধকার আচরণের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রগুলোর একটি।

আপনি একটি ঘটনা স্পষ্টভাবে মনে রেখেছেন।

সে বলল—

“এমন কিছু কখনো ঘটেনি।”

আপনি বললেন—

“আমি নিজের চোখে দেখেছি।”

সে বলল—

“তোমার স্মৃতিই ভুল।”

আপনি কষ্ট পেলেন।

সে বলল—

“তুমি অতিরিক্ত সংবেদনশীল।”

ধীরে ধীরে আপনি নিজের বিচারবুদ্ধি নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

এটাই গ্যাসলাইটিংয়ের বিপজ্জনক দিক।

তবে প্রতিটি মতবিরোধ গ্যাসলাইটিং নয়। মানুষের স্মৃতি ভুল হতে পারে, দুইজনের একই ঘটনার ভিন্ন স্মৃতিও হতে পারে।

পার্থক্য হলো—গ্যাসলাইটিং সাধারণত একটি পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন, যেখানে অন্য ব্যক্তির বাস্তবতা ও আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করা হয়।


৮. শ্রেষ্ঠত্ববোধ—“আমি অন্যদের মতো নই”

মানুষের আত্মবিশ্বাস ভালো জিনিস।

কিন্তু আত্মবিশ্বাস আর শ্রেষ্ঠত্ববোধ এক নয়।

আত্মবিশ্বাস বলে:

“আমি পারব।”

অহংকার বলে:

“আমি তোমার চেয়ে ভালো।”

অন্ধকার মানসিকতার একটি দিক হতে পারে এমন বিশ্বাস—

“আমার জন্য নিয়ম আলাদা।”

“আমি বিশেষ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য।”

“আমি যা করি, তার কারণ আছে।”

“অন্যরা আমার প্রয়োজন পূরণ করার জন্য।”

এখানে মানুষ ধীরে ধীরে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে।


৯. প্রজেকশন—নিজের অন্ধকার অন্যের ওপর ছুড়ে দেওয়া

এটি মানুষের মনস্তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নিজে মিথ্যা বলছে—অন্যকে মিথ্যাবাদী বলা।

নিজে প্রতারণা করছে—অন্যকে প্রতারক বলা।

নিজেই নিয়ন্ত্রণ করছে—অন্যকে নিয়ন্ত্রণকারী বলা।

নিজের অপরাধ ঢাকতে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা।

এভাবে মানুষ নিজের ভেতরের অস্বস্তিকর সত্যকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে।

ফলে ভুক্তভোগী সারাক্ষণ নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকে।

আর প্রকৃত সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায়।


১০. সম্পর্কের শক্তি শুষে নেওয়া

কিছু সম্পর্কের পর আপনি নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন—

“আমি এত ক্লান্ত কেন?”

আপনি হয়তো সারাদিন কোনো শারীরিক পরিশ্রম করেননি।

তবু মনে হচ্ছে মাথার ভেতর যুদ্ধ চলছে।

কারণ প্রতিদিন আপনাকে—

  • ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে,
  • নিজেকে প্রমাণ করতে হচ্ছে,
  • ঝগড়া সামলাতে হচ্ছে,
  • অন্যের রাগ অনুমান করতে হচ্ছে,
  • অপরাধবোধে ভুগতে হচ্ছে,
  • সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিতে হচ্ছে।

এমন সম্পর্ককে অনেকে emotionally draining relationship বলেন।

একটি সুস্থ সম্পর্ক সবসময় আনন্দের হবে না।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটি আপনাকে ক্রমাগত ভেঙে দেওয়ার কথা নয়।


১১. আদর্শায়ন → মূল্যহ্রাস → পরিত্যাগ

অন্ধকার সম্পর্কের একটি পরিচিত প্যাটার্ন হতে পারে:

“তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ মানুষ।”

তারপর—

“তোমার মতো খারাপ মানুষ আমি কখনো দেখিনি।”

প্রথমে অতিরিক্ত প্রশংসা।

তারপর ধীরে ধীরে সমালোচনা।

তারপর অপমান।

তারপর দূরত্ব।

তারপর পরিত্যাগ।

কখনো আবার একই চক্র শুরু হয়।

এই কারণে ভুক্তভোগী বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।

তিনি ভাবেন—

“যে মানুষটি আমাকে এত ভালোবাসত, সে এত বদলে গেল কীভাবে?”

কখনো উত্তরটি হলো—মানুষটি বদলায়নি; সম্পর্কের বিভিন্ন পর্যায়ে তার বিভিন্ন আচরণ প্রকাশ পেয়েছে।


১২. বাইরে ফেরেশতা, ঘরে অন্য মানুষ

মানুষের অন্ধকার দিকের সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হলো দ্বৈত উপস্থাপন।

সবার সামনে—

ভদ্র।

হাসিখুশি।

সাহায্যকারী।

সমাজে জনপ্রিয়।

কিন্তু একান্ত সম্পর্কে—

অপমানজনক।

নিয়ন্ত্রণকারী।

ভয় দেখানো।

ম্যানিপুলেটিভ।

এই কারণেই অনেক ভুক্তভোগীর কথা কেউ বিশ্বাস করতে চান না।

মানুষ বলে—

“অসম্ভব! ও তো খুব ভালো মানুষ!”

কিন্তু মনে রাখতে হবে—

সামাজিক ইমেজ আর ব্যক্তিগত চরিত্র একই জিনিস নয়।

তাই কাউকে বিচার করার সময় শুধু সে অন্যদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা নয়, বরং সে তার ওপর নির্ভরশীল, দুর্বল বা ঘনিষ্ঠ মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।


১৩. মানুষের অন্ধকার—শয়তান কি বাইরে, নাকি আমাদের ভেতরেও?

এখানে এসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে।

আমরা কি প্রতিটি খারাপ মানুষকে “শয়তান” বলে এড়িয়ে যাব?

নাকি মানুষের অন্ধকারকে বুঝতে চেষ্টা করব?

ইসলাম আমাদের সতর্ক করে মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন উভয় অবস্থার ব্যাপারে।

মানুষের মধ্যে নফস, অহংকার, হিংসা, লোভ, প্রতারণা, জুলুম—এসব প্রবণতা থাকতে পারে।

কিন্তু এখানেই মানুষের দায়িত্বও শুরু হয়।

কারণ খারাপ প্রবণতা থাকা আর সেই প্রবণতার কাছে আত্মসমর্পণ করা এক জিনিস নয়।

একজন মানুষ রাগান্বিত হতে পারেন—কিন্তু রাগের কারণে জুলুম না করাও তার দায়িত্ব।

একজন মানুষ লোভী হতে পারেন—কিন্তু প্রতারণা না করাও তার সিদ্ধান্ত।

একজন মানুষ ক্ষমতা পেতে চাইতে পারেন—কিন্তু অন্যকে পদদলিত না করাও তার নৈতিক দায়িত্ব।

তাই মানুষের অন্ধকার বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য অন্যকে “দানব” বানানো নয়।

বরং নিজের ভেতরেও প্রশ্ন করা—

“আমার মধ্যে কি এর কোনো অংশ আছে?”


নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চিনুন

আমরা প্রায়ই নার্সিসিস্ট, টক্সিক মানুষ বা খারাপ মানুষের সন্ধান করি।

কিন্তু আয়নাটা যদি নিজের দিকে ঘোরাই?

আমি কি কখনো অন্যের দুর্বলতাকে ব্যবহার করি?

আমি কি ভুল করলে ক্ষমা চাইতে পারি?

আমি কি নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিই?

আমি কি কাউকে ভালোবাসার নামে নিয়ন্ত্রণ করি?

আমি কি কারও কষ্ট দেখে মনে মনে আনন্দ পাই?

আমি কি নিজের সম্মান রক্ষার নামে অন্যকে অপমান করি?

আমি কি ভুল স্বীকার করতে পারি?

আমি কি “না” শুনলে প্রতিশোধ নিতে চাই?

আমি কি নিজের ভালো ইমেজ রক্ষার জন্য সত্যকে বিকৃত করি?

এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর।

কিন্তু আত্মশুদ্ধির শুরু অনেক সময় অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই হয়।


শেষ কথা: অন্ধকারকে চিনুন, কিন্তু মানুষকে অন্ধভাবে বিচার করবেন না

মানুষের অন্ধকার দিক বাস্তব—কিন্তু প্রতিটি অদ্ভুত আচরণ মানেই নার্সিসিজম নয়।

একটি মুচকি হাসি কাউকে নার্সিসিস্ট বানায় না।

একবার রাগ করা কাউকে বিষাক্ত মানুষ বানায় না।

একটি ভুল স্মৃতি গ্যাসলাইটিং নয়।

একটি আত্মবিশ্বাসী আচরণ অহংকারের প্রমাণ নয়।

চরিত্র বোঝার জন্য একটি মুহূর্ত নয়, একটি প্যাটার্ন দেখুন।

কেউ কি নিয়মিতভাবে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করে?

নিয়মিতভাবে মিথ্যা বলে?

নিজের ভুলের দায় নেয় না?

দুর্বলতার সুযোগ নেয়?

মানুষকে ব্যবহার করে?

অন্যের সীমারেখাকে সম্মান করে না?

নাকি সে নিজের ভুল বুঝতে পারে, ক্ষমা চাইতে পারে এবং পরিবর্তনের চেষ্টা করে?

এই পার্থক্যটাই গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অন্ধকার মানুষকে চিনে ফেলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—

নিজের অন্ধকারকে চিনতে শেখা।

আর যখন আপনি অন্যের অন্ধকার চিনতে শিখবেন, তখন তার প্রতি ঘৃণা নয়—সীমারেখা, সচেতনতা এবং প্রয়োজন হলে দূরত্ব তৈরি করাই হতে পারে আপনার সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রতিক্রিয়া।

নিজেকে রক্ষা করুন।
নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখুন।
অন্যের অন্ধকার চিনুন।
আর সবচেয়ে বেশি—নিজের ভেতরের অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখুন।

কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ অনেক সময় অন্য কারও সঙ্গে নয়—

নিজের নফস, অহংকার, লোভ ও অন্ধকারের সঙ্গে।

আল্লাহ আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন, জুলুম থেকে রক্ষা করুন এবং অন্যের প্রতি ন্যায় ও সহমর্মিতা দেখানোর তাওফিক দিন।

আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

Similar Posts

  • কীভাবে নিজের জীবনটা নষ্ট করবেন—একটি অন্ধকার বিজ্ঞান

    সতর্কতা: এটি সুখী হওয়ার গাইড নয়। বরং কীভাবে ধীরে ধীরে নিজের জীবনকে অসুখী, অগোছালো ও অর্থহীন করে তোলা যায়—তার একটি ব্যঙ্গাত্মক নির্দেশিকা। আপনি কি চান আপনার জীবনটা আরও কঠিন হোক? চান সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনো লক্ষ্য না থাকুক? কাজ জমতে জমতে পাহাড় হয়ে যাক? সম্পর্কগুলো একে একে নষ্ট হয়ে যাক? নিজের ওপর বিশ্বাস কমতে…

  • |

    মনের বদল, না বাইরের বদল আগে

    আসসালামু আলাইকুম প্রিয় পাঠকবৃন্দ, দেশ প্রবাস দেশের সকল সম্মানিত পাঠকদের জানাই আন্তরিক সালাম ও শুভেচ্ছা জীবনে অনেক সময় আমরা একটা ভুল ধারণায় আটকে থাকি। আমরা ভাবতে থাকি—প্রথমে বাইরের অবস্থা বদলাক, তারপর আমি বদলাব। চাকরি ভালো হলে শুরু করব, টাকা থাকলে সাহস করব, সঠিক মানুষ পেলে সম্পর্ক গড়ব, সময় পেলে নিজের যত্ন নেব। কিন্তু বাস্তবতা অনেক…

  • |

    নার্সিসিস্টিক সম্পর্ক: অন্ধকারের ভেতর লুকানো আলোর ইঙ্গিত

    ভূমিকা প্রবাসে বা দেশে—জীবনের যেকোনো পর্যায়ে আমরা এমন মানুষের মুখোমুখি হই, যারা প্রথমে আমাদের মুগ্ধ করে, তারপর ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলে। নার্সিসিস্টিক সম্পর্ক এমনই এক অন্ধকার অভিজ্ঞতা। অনেকেই মনে করেন এটি শুধু যন্ত্রণা আর ক্ষতি। কিন্তু যদি গভীরভাবে দেখি, তাহলে দেখা যায়—এই অন্ধকারের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আলোর ইঙ্গিত। আল্লাহ কখনো কখনো আমাদের এমন পরীক্ষার মধ্য…

  • | | |

    প্রেমের নামে প্রতারণা: একজন পুরুষের যে ১০টি সতর্ক সংকেত চিনে রাখা উচিত

    প্রবাসে থাকা একজন পুরুষের হাতে টাকা থাকতে পারে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকতে পারে, পরিবারকে ভালো রাখার ইচ্ছা থাকতে পারে। কিন্তু একটা জায়গায় ভুল সিদ্ধান্ত তার বহু বছরের কষ্টের কারণ হতে পারে—সম্পর্ক। বিদেশে একাকীত্ব, emotional support-এর প্রয়োজন, পরিবার থেকে দূরত্ব এবং দ্রুত একজন আপন মানুষ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এসব কারণে প্রবাসী পুরুষ অনেক সময় সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি…

  • পৃথিবীর সব নার্সিসিস্ট কি একই অন্ধকার থেকে আসে?

    দেশ ভিন্ন হলেও নার্সিসিস্টের স্বভাব একই রকম থাকে! কেন পৃথিবীর মানচিত্রে হাজারো দেশ, হাজারো ভাষা, হাজারো সংস্কৃতি। মানুষের চোখের রং আলাদা, উচ্চারণ আলাদা, ধর্ম আলাদা। কিন্তু একধরনের মানুষ আছে যারা এই সব পার্থক্যের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তারা যে দেশেই জন্মাক না কেন, তাদের আচরণের ছায়া একই রকম। যেন তারা সবাই একই অন্ধকার শিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ…

  • | |

    আত্মিক কোটিপতি

    টাকা আপনার দাস, আপনি টাকার দাস নন আসসালামুয়ালাইকুম প্রিয় পাঠক, কোটিপতি হওয়া শুধু ব্যাংক ব্যালেন্সের বিষয় নয়। একজন সত্যিকারের ধনী মানুষ সে-ই, যে নিজের সম্পদ, সময়, জ্ঞান ও ক্ষমতা দিয়ে অন্যের জীবনেও মূল্য যোগ করে। আপনি পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার সময় আপনার টাকা আপনার সঙ্গে যাবে না। কিন্তু আপনার কাজ, চরিত্র, উপকার ও অবদান মানুষের জীবনে…