|

রাসূল (সা.) কেন দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় চাইতেন?


প্রবাসে জীবন মানেই সংগ্রাম। দূর দেশে একা বা পরিবার নিয়ে বসবাস, চাকরির অনিশ্চয়তা, উচ্চ খরচ, দেশে পরিবারের দায়িত্ব, ঋণের বোঝা—এসব মিলিয়ে অনেক সময় মন ভেঙে যায়। দারিদ্র্য আর ঋণ শুধু পকেট খালি করে না, সম্মান কমায়, মানুষের কাছে ছোট করে, দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম করে এবং আল্লাহর ইবাদতেও মন বসতে দেয় না। অনেক সময় মানুষ হতাশায় পড়ে হারাম পথে পা বাড়ায়।

এই কষ্টের মাঝেই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হলো—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই দারিদ্র্য ও ঋণের বোঝা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন। তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, উম্মাহকে শেখানোর জন্যই এ দোয়াগুলো শিখিয়ে গেছেন। কারণ তিনি জানতেন, দারিদ্র্য মানুষকে কুফরের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে, সম্মান নষ্ট করে এবং দ্বীনের ওপর অটল থাকা কঠিন করে তোলে।

কেন রাসূল (সা.) দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় চাইতেন?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো দারিদ্র্যকে গৌরবের বিষয় হিসেবে নেননি এমনভাবে যে মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে গরিব থাকতে বলা হয়। বরং তিনি হালাল উপার্জন, পরিশ্রম এবং আত্মনির্ভরশীলতার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সাথে তিনি দারিদ্র্যের বিপদগুলোও স্পষ্ট করেছেন:

  • দারিদ্র্য মানুষকে ছোট করে, কটু কথা শুনতে বাধ্য করে এবং সম্মান হারাতে পারে।
  • ঋণের বোঝা দুশ্চিন্তা বাড়ায়, ঘুম নষ্ট করে এবং ইবাদতে মনযোগ কমায়।
  • চরম অভাবে মানুষ হতাশায় পড়ে হারাম কাজে লিপ্ত হতে পারে।
  • এজন্যই তিনি দারিদ্র্য, অভাব, অসম্মান এবং ঋণের চাপ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছেন।

তিনি চাইতেন উম্মাহ যেন স্বচ্ছল থাকে, হালাল উপার্জন করে, পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতে পারে।

দারিদ্র্য ও ঋণ থেকে মুক্তির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া

১. দারিদ্র্য, অভাব ও অসম্মান থেকে আশ্রয়ের দোয়া

اللَّهُمَّ إِن أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْقِلَّةِ وَالذِّلَّةِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিনাল-ফাকরি ওয়াল-কিল্লাতি ওয়ায-যিল্লাতি, ওয়া আউযু বিকা মিন আন আযলিমা আও উযলামা।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দারিদ্র্য, অভাব ও অসম্মান থেকে আশ্রয় চাই। আর আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই যেন আমি কাউকে জুলুম না করি এবং নিজেও জুলুমের শিকার না হই।

রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ।


২. ঋণ পরিশোধ ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তির বিস্তারিত দোয়া

اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ وَرَبَّ الأَرْضِ وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، رَبَّنَا وَرَبَّ كُلِّ شَىْءٍ، فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى، وَمُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَىْءٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهِ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَىْءٌ، وَأَنْتَ الآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَىْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَىْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَىْءٌ، اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বাস-সামাওয়াতি ওয়া রাব্বাল-আরদি ওয়া রাব্বাল-আরশিল-আজীম, রাব্বানা ওয়া রাব্বা কুল্লি শাইইন, ফালিকাল-হাব্বি ওয়ান-নাওয়া, ওয়া মুনযিলাত-তাওরাতি ওয়াল-ইনজীলি ওয়াল-ফুরক্বান, আউযু বিকা মিন শাররি কুল্লি শাইইন আনতা আখিযুন বিনাসিয়াতিহি। আল্লাহুম্মা আনতাল-আউওয়ালু ফালাইসা কাবলাকা শাইউন, ওয়া আনতাল-আখিরু ফালাইসা বা‘দাকা শাইউন, ওয়া আনতায-জাহিরু ফালাইসা ফাওকাকা শাইউন, ওয়া আনতাল-বাতিনু ফালাইসা দূনাকা শাইউন, ইকদি আন্নাদ-দাইনা ওয়া আগনিনা মিনাল-ফাকরি।

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও মহান আরশের রব। আমাদের রব এবং সব কিছুর রব। আপনি বীজ ও আঁটি ফাটানোরালে, তাওরাত, ইনজীল ও ফুরকান অবতীর্ণকারী। আমি আপনার কাছে এমন সব কিছুর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই যার মাথা আপনি ধরে রেখেছেন। হে আল্লাহ! আপনিই প্রথম, আপনার আগে কিছু নেই। আপনিই শেষ, আপনার পরে কিছু নেই। আপনিই প্রকাশ্য, আপনার ঊর্ধ্বে কিছু নেই। আপনিই অপ্রকাশ্য, আপনার অগোচরে কিছু নেই। আমাদের ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং দারিদ্র্য থেকে আমাদের অমুখাপেক্ষী করে দিন।

রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম।


৩. দুশ্চিন্তা, অলসতা, ঋণের বোঝা ও মানুষের কঠোরতা থেকে আশ্রয়ের দোয়া
(আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা)

একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অসময়ে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি বলেন, ঋণ ও দুশ্চিন্তার কারণে এসেছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এই দোয়া শেখান এবং বলেন, সকাল-সন্ধ্যায় পড়বেন।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিনাল-হাম্মি ওয়াল-হাযানি, ওয়া আউযু বিকা মিনাল-আজযি ওয়াল-কাসালি, ওয়া আউযু বিকা মিনাল-জুবনি ওয়াল-বুখলি, ওয়া আউযু বিকা মিন গালাবাতিদ-দাইনি ওয়া কাহরির-রিজাল।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা থেকে আশ্রয় চাই। অপারগতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাই। কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে আশ্রয় চাই। আর ঋণের বোঝা এবং মানুষের কঠোরতা/অত্যাচার থেকে আশ্রয় চাই।

রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ। আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তিনি এই দোয়া পড়তে থাকেন এবং আল্লাহ তার দুশ্চিন্তা দূর করেন ও ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন।

উপসংহার

প্রিয় প্রবাসী ভাই ও বোনেরা, দারিদ্র্য ও ঋণ বড় মুসিবত। কিন্তু আল্লাহর রহমত আরও বড়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, শুধু চেষ্টা করলেই হবে না—চেষ্টার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। হালাল উপার্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমান, দেশের পরিবারের দায়িত্ব পালন করুন, কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।

প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়াগুলো পড়ুন। আল্লাহ ইনশাআল্লাহ আপনাদের ঋণ মুক্ত করবেন, রিজিক প্রশস্ত করবেন এবং সম্মান রক্ষা করবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দারিদ্র্য, ঋণ ও দুশ্চিন্তা থেকে হিফাজত করুন। আমীন।

Similar Posts

  • |

    প্রবাসে সুখের আসল ঠিকানা: টাকা নয়, সম্পর্ক

    প্রবাসে জীবন মানে অনেকের কাছেই স্বপ্ন পূরণ। ভালো চাকরি, ভালো আয়, পরিবারের জন্য টাকা পাঠানো, বাড়ি-গাড়ি কেনার পরিকল্পনা। কিন্তু রাতের বেলা একা থাকার সময়, বা পরিবারের কোনো খবর পেলে হঠাৎ করে যেন বুকের ভেতরটা খালি হয়ে যায়। অনেকেই তখন ভাবেন—টাকা তো আছে, সুযোগ-সুবিধাও আছে, তাহলে মন কেন এত অস্থির? বিজ্ঞান ও হার্ভার্ডের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বলছে,…

  • | | |

    প্রবাসীর জন্য ব্যবসার সবচেয়ে বড় Capital শুধু টাকা নয়

    প্রবাসীর জন্য ব্যবসার সবচেয়ে বড় Capital শুধু টাকা নয় প্রবাসে থাকা একজন মানুষের হাতে হয়তো বড় অঙ্কের টাকা নেই। তবুও তার এমন কিছু সম্পদ থাকতে পারে যা একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। সেগুলো হলো— অভিজ্ঞতা।Network।Market knowledge।বিদেশি exposure।Discipline।Customer behaviour সম্পর্কে ধারণা। ধরুন আপনি ১০ বছর কোনো বিদেশি দেশে কাজ করেছেন। আপনি সেখানে দেখেছেন— মানুষ কীভাবে…

  • | | | |

    প্রবাসী পুরুষের জন্য ৭টি মানসিক শক্তি: স্ত্রী, পরিবার ও সম্পর্ক সামলানোর কৌশল

    প্রবাসে থাকা মানে শুধু দেশের বাইরে থাকা নয়—অনেক সময় নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর কাছ থেকেও দূরে থাকা। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম, কাজের চাপ, একাকিত্ব, অর্থনৈতিক দায়িত্ব, ভবিষ্যতের চিন্তা—সবকিছুর সঙ্গে একজন প্রবাসী পুরুষকে লড়াই করতে হয়। তারপর রাতে যখন স্ত্রী ফোন করে, হয়তো সামান্য একটি কথাকে কেন্দ্র করে মনোমালিন্য হলো। স্ত্রী বললেন,“তুমি এখন আর আগের…

  • |

    মানুষকে খুশি করা কঠিন, কিন্তু আল্লাহকে খুশি করা সহজ

    (ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. এর বক্তব্যের আলোকে) মানুষকে খুশি করা কঠিন। আর খুশি রাখা—খুশির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা—সহজ নয়, আরও কঠিন। ঠিক না? কত কষ্ট করেছি স্ত্রীর জন্য। তাকে খুশি করতে মা ছাড়ছি, বাপ ছাড়ছি, ভাই ছাড়ছি। পনেরো বছর পর সেই স্ত্রী চলে যায়। ঘটে না এরকম? তবে পুরুষেরা তো এই আকাম করে না? করে। যে…

  • |

    প্রবাসী হবার ফায়দাগুলো পরিপূর্ণভাবে নিচ্ছেন তো?

    আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস:  **“মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের অনুসারী হয়। সুতরাং প্রত্যেকেই যেন লক্ষ রাখে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।”**  (সুনান আবু দাউদ) প্রবাসী হওয়া মানে শুধু বিদেশে থাকা নয়। এটি একটি বিশাল সুযোগ। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন চিন্তাভাবনা এবং নিজেকে বদলে ফেলার এক অনন্য সুযোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আপনি কি এই সুযোগগুলো…

  • |

    পৃথিবীর সব নার্সিসিস্ট কি একই অন্ধকার থেকে আসে?

    দেশ ভিন্ন হলেও নার্সিসিস্টের স্বভাব একই রকম থাকে! কেন পৃথিবীর মানচিত্রে হাজারো দেশ, হাজারো ভাষা, হাজারো সংস্কৃতি। মানুষের চোখের রং আলাদা, উচ্চারণ আলাদা, ধর্ম আলাদা। কিন্তু একধরনের মানুষ আছে যারা এই সব পার্থক্যের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তারা যে দেশেই জন্মাক না কেন, তাদের আচরণের ছায়া একই রকম। যেন তারা সবাই একই অন্ধকার শিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ…