প্রবাসীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ: কাদের ধার দেবেন না?
প্রবাসে জীবন মানে শুধু উপার্জন নয়। এটি মানে দূর থেকে পরিবারের দায়িত্ব পালন, স্বপ্ন পূরণ এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা গড়ে তোলা। কিন্তু অনেক সময় আবেগ, আত্মীয়তার টান বা সহানুভূতির বশে আমরা এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যা আমাদের কষ্টার্জিত অর্থকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
দেশ প্রবাস দেশ-এ আমরা বিশ্বাস করি—সঠিক আর্থিক পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কাদের ধার দেবেন এবং কাদের দেবেন না তা পরিষ্কারভাবে জানা।
আজকের আলোচনায় আমরা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ইসলামী নির্দেশনার আলোকে এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. যারা বিলাসী জীবন যাপন করে এবং ধার নেওয়াকে অভ্যাস করেছে
প্রবাসে অনেক সময় এমন মানুষের দেখা মেলে, যারা নিয়মিত বিলাসিতায় অভ্যস্ত। তারা বারবার ধার নেয়, কিন্তু ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করে।
এ ধরনের মানুষের কাছে টাকা দিলে ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ তাদের জীবনযাত্রার ধরনই এমন যে, তারা সহজে সঞ্চয় করতে পারে না।
দেশ প্রবাস দেশ-এর পরামর্শ:
এ ধরনের মানুষের থেকে দূরে থাকুন। কাছাকাছি থাকা মানেই নিজের কষ্টের টাকাকে ঝুঁকিতে ফেলা।
২. হঠাৎ দুর্যোগ বা দুর্ঘটনায় পড়া মানুষ
যদি কেউ হঠাৎ কোনো দুর্যোগ, দুর্ঘটনা বা অপ্রত্যাশিত বিপদে পড়ে ধার চায় এবং আপনার সামর্থ্য থাকে, তাহলে সাহায্য করুন।
তবে ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবেন না। ভালোভাবে ও ধৈর্যসহকারে ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করুন।
৩. দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা বা অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা
অনেক সময় কেউ দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতায় বা লাইফস্টাইলজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে সাহায্য চায়।
এ ক্ষেত্রে যদি আপনি সাহায্য করতে পারেন, তাহলে করুন। কিন্তু এই টাকা ফেরত পাওয়ার আশা রাখবেন না।
আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারায় বলেছেন:
“যদি ঋণগ্রহীতা অভাবী হয়, তাহলে সে সচ্ছল না হওয়া পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি তোমরা মাফ করে দাও, তাহলে সেটা তোমাদের জন্য আরও উত্তম—যদি তোমরা জানতে।”
(সূরা বাকারা, আয়াত ২৮০)
এখানে মূল কথা হলো—বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করা মানবতা। কিন্তু এটাকে ধার হিসেবে গণ্য করবেন না।
৪. দৈনন্দিন ছোটখাটো প্রয়োজন
খাবার কেনা, গাড়িভাড়া, স্কুলের ফি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য ছোট অঙ্কের ধার—এগুলো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
সূরা মাউনে আল্লাহ তাআলা এমন মানুষদের সমালোচনা করেছেন, যারা ছোটখাটো প্রয়োজনেও সাহায্য করতে দ্বিধা করে।
তাই সামর্থ্য থাকলে খুশি মনে দিন। টাকা ফেরত পেলে ভালো, না পেলে আরও ভালো। এই ছোট সাহায্যই প্রকৃত মানবতা।
৫. লাভের আশায় ধার দেওয়া থেকে বিরত থাকুন
কখনোই লাভের আশায় কাউকে ধার দেবেন না। এতে প্রতারণার ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
প্রবাসে অনেকেই “বিনিয়োগ” বা “ব্যবসার লোভে” টাকা দিয়ে পরে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন।
দেশ প্রবাস দেশ-এর স্পষ্ট পরামর্শ:
লাভের আশায় ধার দেওয়া মানে নিজের অর্থকে ঝুঁকিতে ফেলা। এ ধরনের প্রস্তাব এড়িয়ে চলুন।
৬. সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যা যা বিবেচনা করবেন
যখনই কেউ ধার চায়, তখন নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন:
- সে কি হঠাৎ প্রয়োজনে এসেছে, নাকি ধার নেওয়া তার অভ্যাস?
- তার জীবনযাত্রার ধরন কেমন?
- আমি কি সত্যিই এই টাকা হারানোর সামর্থ্য রাখি?
- ফেরত না পেলে কি আমার নিজের পরিবারের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়বে?
বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিন। আবেগে পড়ে সিদ্ধান্ত নিলে পরে অনুশোচনা করতে হয়।
৭. যদি একবার ভুল হয়ে যায়
যদি কোনো কারণে টাকা চলে যায় এবং ফেরত পাওয়া কঠিন হয়, তাহলে সেই টাকার পেছনে সময় নষ্ট করবেন না।
বরং সেই সময়টা নিজের উপার্জন বাড়ানোর কাজে লাগান। একবারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হোন।
শেষ কথা
প্রবাসে উপার্জন সহজ নয়। প্রতিটি টাকার পেছনে থাকে কষ্ট, ত্যাগ এবং পরিবারের স্বপ্ন। তাই আর্থিক সিদ্ধান্তে আবেগ নয়, বুদ্ধি ও নীতি অনুসরণ করা জরুরি।
দেশ প্রবাস দেশ-এ আমরা চাই প্রবাসীরা শুধু উপার্জনই না করুক, বরং সেই উপার্জনকে সুরক্ষিত রাখতে শিখুক।
সঠিক মানুষকে সাহায্য করুন।
ভুল মানুষের কাছ থেকে নিজেকে রক্ষা করুন।
এবং সবসময় মনে রাখুন—আপনার কষ্টের টাকা আপনার পরিবারের ভবিষ্যৎ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দিন।
— দেশ প্রবাস দেশ
